মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবীর জেনারেল (অবঃ)এমএজি ওসমানীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজঃ বঙ্গবীর এমএজি ওসমানীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে গত রবিবার,৩০ আগস্ট ২০২৬,বাংলাদেশ সময় ১১টায় এবং নিউইয়র্ক অপরাহ্নে ১টায়।খবর আইবিএননিউজ ।এতে সভাপতিত্ব করেন আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের আহবায়ক ও গবেষক এডভোকেট এএনএম ঈসা ও পরিচালনা করেন আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের সদস্য সচিব এবং সভার স্পীকার এমএ রউফ ।সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক,যুক্তরাজ্য এর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এর সাবেক শিক্ষক,অধ্যাপক ড.মনিরুজ্জামান খান।বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নাজমুল গনী, মেজর ইমরান মিয়া, জাতীয় তরুণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফজলুল হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান, জালাল উদ্দিন, বাংলাদেশ আজাদ পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ খান, আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের অন্যতম উপদেষ্টা সিনিয়র সাংবাদিক এবং লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন,ফ্রান্স প্রতিনিধি মির্জা সুমন, গাজীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল ওহাব রিংকু, ইসমাইল খান, আমিনুর রশিদ ইউকে এবং ফজলুল করিমসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্ত নেতৃবৃন্দ। “বঙ্গবীর ওসমানীর ঐতিহাসিক মর্যাদা রক্ষা করতে হবে” — অ্যাডভোকেট এএনএম ইসা সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট এএনএম ইসা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জেনারেল এমএজি ওসমানীর ভূমিকা স্বতন্ত্র ও ঐতিহাসিক। তাঁর নামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত “বঙ্গবীর” উপাধি বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জাতীয় সম্মানের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, ইতিহাসের স্বীকৃত উপাধি ও মর্যাদা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা উচিত নয়। কারও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের পরিচয় ও মর্যাদাকে অস্পষ্ট করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হবে। তিনি বলেন,”ইতিহাস যার যে মর্যাদা দিয়েছে, সেই মর্যাদা তাকে দিতে হবে। ওসমানীর ঐতিহাসিক অবদানকে ছোট করা যেমন অন্যায়, তেমনি তাঁর স্বীকৃত পরিচয়কে নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করাও সমীচীন নয়।” অ্যাডভোকেট এএনএম ইসা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের বহুল আলোচিত বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু একটি পতাকা বা ভূখণ্ড অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হয়। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হলে সংসদ, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করতে হবে।“রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার বহু লক্ষণ বাংলাদেশে দৃশ্যমান” — ড. মনিরুজ্জামান খান প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মনিরুজ্জামান খান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দুর্বল বা ব্যর্থ হওয়ার পথে গেলে সাধারণত প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, জবাবদিহি কমে যায়, অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে এবং নাগরিকদের আস্থা নষ্ট হয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এসব বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় প্রবাসী বাংলাদেশিরা অর্থ, জনমত, কূটনৈতিক প্রচার এবং নানাভাবে দেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আজকের বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতেও প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সংগঠিত ভূমিকা প্রয়োজন। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি পাঁচটি পর্যায়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার একটি ধারণা তুলে ধরেন। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নাজমুল গনী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় নেতৃত্বের মূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তন না করে গবেষণা, দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। “আশা হারালে চলবে না” — হারুনুর রশিদ খান বাংলাদেশ আজাদ পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হারুনুর রশিদ খান বলেন, দেশের বর্তমান সমস্যা যত কঠিনই হোক, আশা ছেড়ে দিলে চলবে না। তিনি বলেন,“স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। হতাশা কোনো জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে না।” “স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল অনেক বড়” — বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান বীর মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় তাঁদের প্রত্যাশা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরে বলেন, মানুষ অনেক আশা নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের লক্ষ্য ও সুফল জনগণের কাছে কতটা পৌঁছেছে, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি বলেন, কোনো আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনে নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সুশাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত। “ওসমানীকে যথাযথ মূল্যায়ন না করায় জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে” — ফজলুল হক জাতীয় তরুণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফজলুল হক বলেন, জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। তিনি বলেন, ওসমানীর নেতৃত্ব, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলাবোধ এবং রাষ্ট্রচিন্তা থেকে নতুন প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্বাধীনতার পর ওসমানীকে তাঁর অবদানের তুলনায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। ফজলুল হক অ্যাডভোকেট এএনএম ইসার দীর্ঘদিনের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, সংসদকে কার্যকর করতে হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বিবেক ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের স্বার্থ অনুযায়ী কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। তিনি সবাইকে সংসদকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।বিশেষ অতিথি সংগঠনের উপদেষ্টা ও সিনিয়র সাংবাদিক এবং লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন বলেন,মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবীর জেনারেল (অবঃ)এমএজি ওসমানীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ।তিনি আরো বলেন,“ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন, স্বাধীন সংসদ ও প্রবাসীদের অধিকার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়”।“ভারতকে বন্ধু চাই, প্রভু বা শত্রু নয়” — এমএ রউফ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব এমএ রউফ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “ভারতকে আমরা বন্ধু হিসেবে দেখতে চাই; প্রভু হিসেবে নয়, আবার শত্রু হিসেবেও নয়।” তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব প্রয়োজন, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সার্বভৌমত্ব, ন্যায্যতা, পারস্পরিক সম্মান ও উভয় দেশের জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতে। “ওসমানীর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে যথেষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না” — মির্জা সুমন ফ্রান্স থেকে যুক্ত মির্জা সুমন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও তাঁর কর্ম, চিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে প্রয়োজনীয় মাত্রায় তুলে ধরা হচ্ছে না। তিনি বলেন, এমনকি তাঁর ঐতিহাসিক উপাধি ও পরিচয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হওয়া দুঃখজনক। “যে জাতি কৃতজ্ঞতা জানে না, সে জাতি এগোতে পারে না” — জালাল উদ্দিন জালাল উদ্দিন বলেন, একটি জাতির নৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে তার ইতিহাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন,“যে জাতি তার ত্যাগী মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় বীরদের অবদান স্বীকার করতে জানে না, সেই জাতির পক্ষে স্থায়ী উন্নতি অর্জন করা কঠিন।” তিনি ইতিহাসের সঠিক সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।সভায় প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ছয় দফা দাবির প্রতি সমর্থনের আহ্বান আলোচনায় আন্তর্জাতিক রেমিট্যান্স যোদ্ধা সংসদের চলমান ছয় দফা দাবি নিয়েও আলোচনা হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।